বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন

মুক্তবুদ্ধির উপাসক বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল

জনপ্রিয় ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২০ জুন, ২০২০
  • ৪৩ বার পঠিত

জননী সুফিয়া কামাল (২০শে জুন, ১৯১১-২০শে নভেম্বর ১৯৯৯) একাধারে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ঋত্ত্বিক এবং মুক্তবুদ্ধিচর্চার অন্যতম পথিকৃত্। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ভেদবুদ্ধির রাজনীতির বিরুদ্ধে যে লড়াই তিনি পরাধীন ভারতে লড়েছিলেন, অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম লগ্নেই সেই লড়াইতে রাজপথে মানুষের মিছিলের প্রথমসারিতে আমরা দেখি তাকে। ভাষা আন্দোলনে তার উদ্দীপ্ত নেতৃত্ব তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মহিলা সমাজকে সর্বপ্রথম সদ্য স্বাধীন দেশে পশ্চিম পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী চেতনার বিরুদ্ধে, মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের দাবির ভেতর দিয়ে যাবতীয় ভেদ বুদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে সামিল করেছিল। অবিভক্ত পাকিস্তানে তখন সবেমাত্র কায়েম হয়েছে মার্শাল ল’। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আইয়ুব খান ক্ষমতায়। তিনি ক্ষমতা দখল করেই ডাক দিয়েছেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’। শাসনতন্ত্র বলে কোনো কিছুই তখন অবশিষ্ট নেই পাকিস্তানে। রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাজনীতিকদের বেশির ভাগই রয়েছেন কারান্তরালে। অনেকেই আত্মগোপন করে। তার বাইরে যেসব রাজনীতিক আছেন তারাও মামলা মোকর্দমায় বিপর্যস্ত। বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র নিরপেক্ষ অধিকার বলে তখন কোনো কিছুই গোটা পাকিস্তানে অবশিষ্ট নেই। সামরিক শাসনের সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশের ভেতরে সরকারের সমালোচনা তো দূরের কথা, প্রবাহমান বাঙালি সংস্কৃতির কথা যদি উচ্চারিত হয়, তাহলেও তা পরিগণিত হতো রাজদ্রোহ হিসেবেই।

এই রকম একটি নেতিবাচক পরিস্থিতিতে বাঙালির অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্নের সঙ্গেই মিলে যায় সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রশ্নটিও। অর্থনেতিক দাবি এবং সাংস্কৃতিক পিপাসা সম্মিলিতভাবে বাঙালির মনোজগতে যে স্বাধীনতার দাবিটি উসকে দেয়, তার নেতৃত্বেই ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়া সুফিয়া কামাল।

পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ভেতর সঞ্চিরিত করেছিল পশ্চিমের শাসকদের প্রতি সীমাহীন আক্রোশ। তাদের করে তুলেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি যুক্তি নিষ্ঠ সমালোচক। সংস্কৃতির প্রশ্নে তাদের ভেতরে এনেছিল ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পূর্ববাংলার স্বাতন্ত্রবোধকে। এই দলীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলবার সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যমণি হিসেবে রবীন্দ জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন কমিটির সভানেত্রী হিসেবে কবি সুফিয়া কামালের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।

রবীন্দ জন্মশত বর্ষের সময়কাল, ১৯৬১ সাল, সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে এক ভিন্ন প্রেক্ষিত নিয়ে এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু সংস্কৃতির ধারক-বাহক, তাই তিনি ভারতের প্রতীক। তিনি কখনো পাকিস্তানে মর্যাদা পেতে পারেন না—পশ্চিম পাকিস্তানের তল্পিবাহক শাসকদের এমনটাই ছিল অভিমত। তাই হিন্দু সংস্কৃতির প্রতিনিধি হওয়ার দায়ে (!) সমগ্র পাকিস্তানের রেডিও, টেলিভিশনে তখন নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলোও ক্রমশ সঠিক দেখভালের অভাবে ক্রমেই জীর্ণ হয়ে চলেছে। গোটা পূর্ব পাকিস্তানেই সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে বিরাজ করছে এক ভয়াবহ শূন্যতা। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ঢাকাতে যখন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালনের জোরদার প্রস্তুতি চলছে, তখন গোটা কার্যক্রমকে ভেস্তে দিতেই পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি এবং রাজনীতির জগতের প্রগতিশীল মানুষজনদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে সক্রিয়তার অভিযোগে গ্রেফতার হন সে সময়ের বিশিষ্ট যুব নেতা আনোয়ার জাহিদ। গ্রেফতার করা হয় ছাত্র নেতা জাহিরুল ইসলামকে। প্রখ্যাত সাংবাদিক কে জি মোস্তাফা গ্রেপ্তার হন। বিশিষ্ট অধ্যাপক আলাউদ্দিন আল আজাদকেও গ্রেপ্তার করা হয়। চারদিকে এক পাশবিক দমননীতি চালায় সামরিক জুন্টার ধারক-বাহকেরা।

সময়ের প্রেক্ষিতে বিচার করলে বলতে হয়, রবীন্দ্রজন্ম শতবর্ষকে কেন্দ্র করে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বাধীন কর্মকাণ্ড ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সংস্কৃতিপ্রেমীদের নেতৃত্বে এক অঘোষিতযুদ্ধ, যা একাত্তরের মহানমুক্তিযুদ্ধের বিশেষ অবদান রেখেছিল। অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংসের যে ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়ে পাক সামরিক শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশের আদলেই বিভাজনকে চিরস্থায়ী করে দিতে চেয়েছিল, সুফিয়া কামালের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সেই নোংরা ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। (ইত্তেফাক)

শেয়য়ার করুন..

এ জাতীয় আরও সংবাদ

© All rights reserved © 2020 jonopriya.com
কারিগরি সহযোগিতায়-SHAHIN প্রয়োজনে:০১৭১৩৫৭৩৫০২ purbakantho
themesba-lates1749691102