শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন

ধনু নদীতে অবৈধ মাছের ঘের, নৌ চলাচল বিঘ্নিত

ধনু নদীতে অবৈধ মাছের ঘের, নৌ চলাচল বিঘ্নিত

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

খালিয়াজুরীর ধনু নদীতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধ ঘের দিয়ে কোটি টাকার মাছ লুটে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা। বাঁশ আর গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরী অবৈধ এসব ঘের স্থাপনের ফলে একদিকে কার্গো, বোলগেট ও অন্যান্য নৌযান চলাচলে বিঘ্নঘটাসহ প্রায়ই ঘটছে নৌ-দূর্ঘটনা, অন্যদিকে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছে উন্মুক্ত এ নদীর মাছ ধরার অধিকার থেকে।

তাছাড়া, ঘের স্থাপনের ফলে ঘেরে বালি আটকে নদীটি ভরাটও হচ্ছে দ্রুত। ঘের সরাতে ঘের মালিকদের উদ্দেশ্যে নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীর তীরবর্তী গ্রামসমূহে প্রায় দু’মাস আগে মাইকিংও করা হয়েছে। তবু ওই ঘের মালিকরা তাদের ঘের তুলে নিচ্ছেন না।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে বৃহস্পতিবার দুপুরে খালিয়াজুরীর সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ জানান, খালিয়াজুরীর লেপসিয়া থেকে পাঁচহাট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকার ধনু নদীতে শতাধিক ঘের রয়েছে। ওই ঘের স্থাপনকারী ৩৬ জনের নামও ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাম না জানাও আছেন অনেকেই। ঘের স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যাবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি আরো জানান, এ যাবৎ ধনু নদীতে টানা ১৩ দিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভ্রাম্যমান আদালত চালিয়ে অবৈধ ঘের স্থাপনকারী সাত জনকে ধরে প্রায় চার লাখ টাকা দন্ড আদায়সহ ৩০/৩৫টি অবৈধ ভিম জাল আর ১০/১৫টি মশারি জাল কেটে ও পুড়িয়ে অপসারন করেন তিনি। ওই দন্ডিতদের মধ্যে অন্যতম হলেন, উপজেলার পাঁচহাট গ্রামের খাইরুল ইসলাম (৪০) ও ফতুয়া গ্রামের মারাজ আলী (৪৫)।

এদিকে, খালিয়াজুরী সদর ইউপি সদস্য অজিত সরকার জানান, প্রতি বছরেই প্রাকৃতিক ভাবে কোটি টাকার মাছ উৎপাদনের খনি হিসেবে পরিচিত এ নদী জেলেদের আশির্বাদে পরিনত হবার কথা ছিল। কিন্তু নদীটিকে ঘিরে স্থানীয় জেলেদের তৈরী হয়েছে মুর্তিয়মান আতঙ্ক। নদীটিতে কিছু প্রভাবশালী অমৎস্যজীবি অবৈধ ঘের তৈরী করে ও চুঙ্গা (বাইম মাছ ধরার বাঁশের ফাঁদ) দিয়ে মাছ শিকার করায় জেলেরা ওই ঘের আর চুঙ্গার আশেপাশেও ঘেষতে পারেন না। যদি ভূলেও ওই ঘের কিংবা চুঙ্গার পাশে কোন জেলে জাল নিয়ে কখনো যায় তবে তার খেসারত দিতে হয় প্রভাবশালীদের লাঠিপেঠা খেয়ে অথবা জাল নৌকা দিয়ে।

খালিয়াজুরী সদরের নয়াপাড়া গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অসংখ্য জেলেরা জানান, ধনু নদী জবর দখলকারী এসব প্রভাবশালী অমৎস্যজীবিদের অধিকাংশই হলেন বর্তমান সরকার দলীয় স্থানীয় নেতা-কর্মী। ওরা ঘের স্থাপনে কেউ আছেন সরাসরি, কেউবা রয়েছেন নেপথ্যে সম্পৃক্ত। অবশ্য, সরকার বদলের সাথে সাথে পরিবর্তন হয় দখলদারের। কিন্তু পরিবর্তন হয় না শুধু অধিকার বঞ্চিত জেলেদের বঞ্চনার।

ওই জেলেরা এ প্রতিবেদকের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘আমরার কতা পরতিকাত লেকলেও আমরার অদিকার কেউ দেওয়ার বেবস্তা করত না’।

নয়াপাড়া গ্রামেরই বাসিন্দা শৈলেন বর্মন (৩৫) ও সুশীল দাস (৩২) বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুস্ক মৌসুমে এ নদীটিকে অবৈধ ঘের ও চুঙ্গার আওতায় রাখছে প্রভাবশালীরা। এ মৌসুমটিতে এখানে মাছ ধরতে গেলেই ওই প্রভাবশালীদের হাতে জেলেরা নির্যাতনের শিকার হন। তারা নিজেরাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান শৈলেন ও সুশীল।

তারা আরো জানান, অধিকার তথা জাল যার জলা তার নীতি থেকে বঞ্চিত হয়ে পূর্ব পুরুষের পেশা মাছ ধরায় থাকতে না পেরে নদীর তীরবর্তী এ গ্রামের ক্ষিতিন্দ্র বর্মন, পরিমল বর্মন, রাখাল বর্মন, অরুন বর্মনসহ প্রায় অর্ধশত লোক পরিবার নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকায়।

এসব ব্যাপারে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এ এইচ এম আরিফুল ইসলাম জানান, ধনু নদী থেকে দ্রুত ঘের উচ্ছেদের মাধ্যমে জেলেদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়াসহ এখানে নির্বিঘ্নে নৌ চলাচলের ব্যাবস্থা করা হবে। ওই ঘের উচ্ছেদের জন্য ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আনসার ব্যাটেলিয়ান চাওয়া হয়েছে। এ ব্যাটিলিয়ান এলেই শুরু হবে ঘের উচ্ছেদে অভিযান।

ভাল লাগলে শেয়ার করবেন




© All rights reserved © 2017 jonopriya.com
Design & Developed BY jonopriya.com